বাঙ্গালী
Thursday 21st of September 2017
code: 80711
হযরত মাসুমা (সাঃ আঃ) এর ওফাত বার্ষিকী

ইতিহাসের পাতায় যেসব মহিয়সী নারীর কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, তাদেরই একজন হলেন হযরত মাসুমা (সা.)। তিনি নবী বংশের বিদুষী নারী হিসাবেও স্বনামধন্য হয়েছেন। তার ওফাত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আমরা তার জীবন চরিত নিয়ে খানিকটা আলোচনা করবো।
হযরত মাসুমা (সা.) ১৭৩ হিজরীর পহেলা জ্বিলকদ মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ইমাম মুসা ইবনে জাফর ছিলেন, নবী বংশের নবম পুরুষ এবং আহলে বাইতের সপ্তম ইমাম। তাঁর মায়ের নাম নাজমা খাতুন এবং তিনি তার যুগের মহিলাদের মধ্যে সম্মানীত ও পরিশীলিত নারী হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ইমাম রেজা (আ.)এর জন্মের পর তার মা নাজমা খাতুনকে তাহেরা উপাধিতে ভুষিত করা হয়। হযরত মাসুমার আসল নাম হচ্ছে ফাতেমা। কিন্তু পরবর্তীতে তার নানা গুন ও বৈশিষ্ট্যের কারণে ইমাম রেজা(আ.) তাকে˜‘মাসুমা’ নামে অভিহিত করেন।
হযরত মাসুমা (সা.) ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানী, কুশলী, বাগ্মি, সচেতন ও অত্যন্ত পারজ্ঞম শিক্ষক। তিনি যে পরিবারে বেড়ে উঠেছেন তাঁর প্রত্যেকেই ছিলেন, অত্যন্ত জ্ঞানী, বিজ্ঞ, পরিশীলিত ও সম্মানিত। কাজেই এমন পবিত্র পরিবারে জন্ম গ্রহনের ফলে তিনি যে অন্যন্য সাধারণ ও ক্ষনজন্মা হয়ে উঠবেন এটাই স্বাভাবিক। হযরত মাসুমা(সা.) তাঁর পিতা ইমাম কাজেম(আ.) এবং ভাই ইমাম রেজা (আ.)এর সংস্পর্শে খুব ছোটবেলা থেকেই জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অত্যন্ত পারদর্শী হয়ে উঠেন। ঐ যুগের অনেক জ্ঞান পিপাসু ব্যক্তি তাঁর সাহচার্য ও তত্ত্বাবধানে অনেক অজানা ও অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধান খুঁজে পান। কথিত আছে, পিতার অনুপস্থিতিতে তিনি জনসাধারনের বহু সমস্যা ও প্রশ্নের সমাধান বাতলে দিতেন। এ প্রসঙ্গে রেডিও তেহরানের বিশ্ব কার্যক্রমের বিশিষ্ট লেখিকা মিসেস আসকারী বলেছেন, একবার বেশ কিছু লোক তাদের কিছু প্রশ্ন ও সমস্যা নিয়ে মদীনায় ইমাম কাজেম (আ.)এর কাছে আসেন। কিন্তু ইমাম কাজেম তখন কোন এক কাজে সফরে ছিলেন। কাজেই অগন্তুকরা বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যাবার কথা ভাবছিলেন। তারা তাদের প্রশ্নগুলো একটা কাগজে লিখে ওনার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। বিদায় বেলায় তারা দেখলেন হযরত মাসুমা (সা.) তাদের সব প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বাতলে দিলেন। আগন্তুকরা অত্যন্ত খুশিমনে নিজেদের গন্তব্য পথে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে ইমাম কাজেম (আ.)এর সাথে তাদের দেখা হলো। তার সব ঘটনা ইমামকে খুলে বললেন। ইমাম কাজেম (আ.) কন্যা মাসুমার লেখা সমাধানগুলো পড়ে বিষ্মিত হন। তিনি তার কন্যার জ্ঞান ও বিচার-বুদ্ধিতে মুগ্ধ হয়ে তাঁর জন্য দোয়া করলেন।
নবী বংশের সপ্তম ইমাম মুসা ইবনে জাফর বা কাজেম (আ.) আহলে বাইতের অন্যান্য ইমামদের মতো সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় ও অটল ছিলেন। সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোন ধরনের দূর্বলতার পরিচয় তিনি দেননি। যার ফলশ্রুতিতে সমকালীন আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ তাঁকে কারাবন্দী করে রাখার নির্দেশ দেয়। ফলে হযরত মাসুমা(সা.) খুব ছোটবেলা থেকেই পিতার সান্নিধ্য হারান এবং পিতার বিচ্ছেদে বেশ দুঃসহ দিন যাপন করেন। এভাবে দীর্ঘ চার বছর অতিক্রান্ত হয়। এরপর কারারুদ্ধ পিতার শাহাদতের খবর যখন হযরত মাসুমার কাছে পৌছে, তখন তাঁর বয়স মাত্র দশ বছর। পিতার শাহাদাতের পর শোকাহত হযরত মাসুমার দেখাশোনা ও প্রতিপালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ইমাম রেজা (আ.)। ফলে পবিত্রতার মর্যাদায় উদ্ভাসিত সুযোগ্য বড় ভাইয়ের আন্তরিকতা ও তত্ত্বাবধানে হযরত মাসুমা নিজেকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং উন্নত মানবীয় গুনাবলীতে সুসজ্জিত করতে সক্ষম হন। ইমাম কাজেম (আ.)এর শাহাদাতের পর তার সুযোগ্য পুত্র রেজা (আ.) একজন শ্রদ্ধাস্পদ ইমাম হিসাবে মুসলমানদের ভালোবাসা, সম্মান ও আনুগত্য লাভ করেছিলেন। তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় তৎকালীন আব্বাসীয় খলিফা মামুন, একে নিজের জন্য হুমকী বলে মনে করতে থাকে। তাই তিনি এক ফরমান জারী করে ইমাম রেজা (আ.)কে মদীনা থেকে খোরাসানে যাবার নির্দেশ দেয়। ইমাম রেজা (আ.) খলিফা মামুনের এ নির্দেশ মানতে বাধ্য হন এবং বিদায় বেলায় তিনি বোন মাসুমাসহ পরিবারের সব সদস্যদের জড়ো করে বলেন, "এটাই হয়তো আমার জীবনের শেষ সফর।"
ইমাম রেজা (আ.)এর খোরাসান সফরের এক বছর পর ২০১ হিজরীতে হযরত মাসুমা (সা.) তাঁর বেশ বিছু সঙ্গী সাথী নিয়ে ভাইকে দেখার জন্য খোরাসানের পথে যাত্রা শুরু করেন। যখন তিনি সাভে শহরে পৌঁছেন, তখন বেশ কিছু দুস্কৃতিকারী যারা কিনা নবী পরিবারের ঘোর শত্রু ছিলেন, তারা হযরত মাসুমার সহযাত্রীদের উপর হামলা চালিয়ে বেশ কিছু লোককে হতাহত করেন। এভাবে সফর সঙ্গীদের মহিলা কয়েকজন সঙ্গী ছাড়া পুরুষদের সবাই শাহাদাত বরন করেন। এ ঘটনায় হযরত মাসুমা অত্যন্ত বেদনাহত ও শোকে বিমর্ষ হয়ে পড়েন। পরে তিনি ইরানের ধর্মীয় নগরী হিসাবে খ্যাত কোমে যান এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন।
হযরত মাসুমা (সা.) কেন কোমে যান এবং তার ঐ সফরের উদ্যেশ্য ইরানের বিশিষ্ট লেখিকা মিসেস আসকারীর কাছে আমরা জানতে চেয়েছিলাম হযরত মাসুমা (আ.) কেন কোমে যান এবং তার ঐ সফরের উদ্দেশ্য কি ছিল? সে সম্পর্কে ইরানের বিশিষ্ট লেখিকা মিসেস আসকারী বললেন, হযরত মাসুমা (সা.)এর আরো অনেক ভাইবোন থাকলেও ইমাম রেজা (আ.)এর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা ও ভালবাসার কারণে তিনি তার খোরাসান সফরের দ্বিতীয় বছরেই ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য মদীনা থেকে খোরাসানের উদ্যেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে তিনি যাত্রা বিরতি ঘটান এবং ইরানের কোম নগরে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কারণ ইরানের কোম নগরের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই জানতেন। আর তা ছাড়া নবী বংশের প্রতি অনুরাগী কোমের বেশ কিছু জনতা যাদের মধ্যে ইমাম কাজেম (আ.) এর বিশিষ্ট সাহাবী মুসা ইবনে খাযরাজও ছিলে, তারা হযরত মাসুমকে কোমে যাবার আমন্ত্রণ জানান। ফলে তিনি ঐ আহ্বানে সাড়া দিয়ে কোমে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। কোমের জনতা অত্যন্ত স্বত:স্ফুর্তভাবে হযরত মাসুমাকে স্বাগত জানান। তারা হযরত মাসুমা (সা.)এর উপস্থিতিকে তাদের জন্য সৌভাগ্য ও কল্যাণ এর উৎস বলে মনে করতে থাকেন। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে কোমে হযরত মাসুমার অবস্থান খুব একটা দীর্ঘায়িত হয়নি। বলা হয় ১৭ দিন অসুস্থ থাকার পর সেখানেই তার ইহজীবনের সমাপ্তি ঘটে। সত্যিই হযরত মাসুমা (সা.) কোম নগরীর জন্য অশেষ কল্যাণ ও সৌভাগ্যের উৎস হয়ে উঠেন। নবী বংশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুরাগী হাজার হাজার নারী পুরুষ এ শহরে জিয়ারতের জন্য সমবেত হতে থাকেন। ফলে অচীরেই কোম নগরী জ্ঞান, ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠে। হযরত মাসুমা (সা.)এর মাজারকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠে বহু দ্বীনি মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র, আলেম ওলামা, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভে আগ্রহী জনতার পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে এ শহর। আজ পবিত্র কোম নগরীর গুরুত্ব কারো অজানা নয়। হযরত মাসুমা (সা.)এর আধ্যাত্মিক প্রভায় ধন্য পবিত্র এই নগরীর মর্যাদা এখন বিশ্ববাসীর কাছে আগের চেয়ে আরও প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। হযরত মাসুমা(সা.)এর মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এই আলোচনা বিশ্ব নবী(সা.) ও তার পবিত্র আহলে বাইতের জীবনাদর্শ অনুসরণের ব্যাপারে আমাদেরকে আরো বেশী উজ্জীবিত করবে এই কামনা করে এই আলোচনা শেষ করছি।(আই আর আই বি)

user comment
 

latest article

  তাওহীদের মর্মবাণী (শেষ কিস্তি)
  তাওহীদের মর্মবাণী-১ম কিস্তি
  তাওহীদ
  অসাধারণ মানুষ ইমাম আলী (আ.)
  হযরত আলীর (আ.) অভিষেক
  পবিত্র ঈদে গাদীর
  গাদিরে খুম
  খেলাফত তথা রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী
  যুগের ইমাম সংক্রান্ত হাদীসের ওপর একটি ...
  প্রকৃতি ও মানুষের সত্তায় পরকালীন জীবনের ...